ইসলামোফোবিয়া: ইসলামকে কলুষিত করতে বিদ্বেষীদের এক অপপ্রয়াস

ইসলামোফোবিয়া: ইসলামকে কলুষিত করতে বিদ্বেষীদের এক অপপ্রয়াস

অধ্যাপক ডঃ নুরুল ইসলাম

ইসলামোফোবিয়া (ইসলামাতঙ্ক) একটি বহুল প্রচলিত পরিভাষা। প্রতিটি শব্দ ও পরিভাষা সৃষ্টির বিশেষ উদ্দেশ্য ও নির্দিষ্ট ইতিহাস আছে। প্রতিটি শব্দ ও পরিভাষা বিশেষ এক অর্থ ও ভাব বহন করে। নির্দিষ্ট শব্দ ও পরিভাষা কখন উদ্ভাবিত ও প্রচলিত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য অনেক ক্ষেত্রে সুলভ নয়।

যতদূর জানা যায়, ইসলামোফোবিয়া পরিভাষার প্রথম ব্যবহার করেন আলজেরিয়ার বিখ্যাত লেখক সোলেমান বিন ইব্রাহিম। ফরাসি ভাষায় রচিত মুহাম্মদের স. জীবন চরিত গ্রন্থে । ১৯১৮ সালে।

১৯৭০ ও ৮০ দশকে বৃটেনে এই শব্দের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তী কালে বিশ্বের সর্বত্র এই পরিভাষার ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। ইসলাম ধর্ম নাকি এক শ্রেণির মানুষের কাছে আতঙ্ক। বস্তুত ইসলাম ধর্মকে কলুষিত করার উদ্দেশ্যে তাকে আতঙ্ক রূপে উপস্থাপন করাকে ইসলামাতঙ্ক বলে।

ইসলামোফোবিয়া বুঝতে হলে প্রেক্ষিতটা বুঝতে হবে। বস্তুত ইসলাম তার আবির্ভাব (৭ম শতাব্দী) থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর সর্বাধিক সম্প্রসারণশীল ধর্ম। এমনকি বিশ্বব্যাপী তথাকথিত ইসলামী সন্ত্রাস বিরোধী অভিযানের সময়েও ইউরোপ ও আমেরিকায় সর্বাধিক প্রসারিত ধর্ম ছিল ইসলাম। শুনলে অলৌকিক মনে হবে, যুগে যুগে যারা ইসলামকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে, পরবর্তী কালে তাদের দ্বারা ইসলামের সর্বাধিক প্রসার ঘটেছে। এই মুহূর্তে ইউরোপ ও আমেরিকা ইসলামের বিরুদ্ধে অসংখ্য যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। আর তাদের দেশে ইসলামের সর্বাধিক প্রসার হচ্ছে।

এ কথা সর্বজন বিদিত যে, মুসলিমরা দীর্ঘ সময় পৃথিবীর জনবহুল অঞ্চলের শাসক ছিল। অধুনা পৃথিবীর বৃহত্তর জাতিসমুহ দীর্ঘ সময় মুসলিম শাসকদের শাসনাধীন ছিল। ইহুদি, খ্রীষ্টান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বিশাল অংশ এক সময় মুসলিমদের শাসনাধীন ছিল। খুব স্বাভাবিক, শাসকদের প্রতি শাসিত শ্রেণির মানুষের মধ্যে ঘৃণার বাতাবরণ তৈরি হয়। আর শাসক সম্প্রদায় যদি শাসিত শ্রেণির মানুষের কাছে সামরিক ক্ষেত্রে পরাজিত হয় তাহলে নেমে আসে প্রতিহিংসা। বিশ্ব ইতিহাসে এই ঘটনার অসংখ্য নজির আছে। একথা ভেবে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদীরা আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মূলনিবাসীদের সমূলে ধ্বংস করে দিয়েছে। আজকের অবাধ স্বাধীনতার হকারদের পূর্ব পুরুষ ছিল তারা। ইসলামোফোবিয়াকে এই প্রেক্ষিতে বিচার করুন।

সত্য বলতে কি, ইসলাম পৃথিবীর একমাত্র ধর্ম যার ধর্মগ্রন্থ ও ইতিহাস আজও অবিকৃত ও নির্ভেজাল। অথচ তার প্রতিদ্বন্দ্বী ধর্মগুলোর ভিত্তি বিকৃত ধর্মগ্রন্থ, অর্ধ সত্য ইতিহাস, রূপকথা, জনশ্রুতি, ঐতিহ্য ও আবেগ ইত্যাদি। তথাকথিত উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীরা বলবেন, কোনো ধর্ম সম্পর্কে একথা বলা ঠিক নয়। সব ধর্ম সমান। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, কোন ধর্মকে ছোট অথবা বড় বলা সমীচীন নয়। তবে সত্য অনুসন্ধান করতে হলে, প্রতিটি ধর্মের উৎস ও ইতিহাস বিষয়ে আলোকপাত জরুরি।
মনে রাখতে হবে, মুসলিম সম্প্রদায় তাদের আকর ধর্ম গ্রন্থ আল-কুরআনের একটি বর্ণের বিকৃতি কখনো মেনে নেবে না। অনুরূপ, হজরত মুহাম্মদের স. জীবন চরিত নিয়ে অশালীন ও অপমানজনক মন্তব্য ও আচরণ কখনো মেনে নেবে না। এভাবেই তারা যুগে যুগে ইসলামের অকৃত্রিমতা ও নির্ভেজালতাকে রক্ষা করে এসেছে। যারা নিজেদের ধর্ম নিয়ে দিনরাত মস্করা করে শিল্প সাহিত্য চর্চা করে তাদের কাছে অপরের ধর্ম বিষয়ে সংবেদনশীল হওয়া আশা করা অবান্তর।

সত্য বলতে কি, পরিসংখ্যান বলছে, যারাই গভীরভাবে ধর্মগ্রন্থ চর্চা করেন, তারাই ইসলামের গুণগ্রাহী হয়ে যান়। এতে ইসলাম বিদ্ধেষীদের অবস্থা হয়, কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা। আজকের ইসলামোফোবিয়াকে এই প্রেক্ষিত ও পটভূমিতে বিচার করতে হবে।

সম্প্রতি ফ্রান্সে হজরত মুহাম্মদের স. ব্যঙ্গ চিত্রাঙ্কন করে কোটি কোটি ধর্ম প্রাণ মানুষের বিশ্বাস ও আবেগে আঘাত করেছে ঐ দেশের কিছু ধর্মদ্রোহী ও ইসলাম বিদ্ধেষী। এক ধর্মোন্মাদ মুসলিম এধরণের এক ইসলাম বিদ্ধেষীকে হত্যা করেছে। এনিয়ে বিশ্বব্যাপী জোর বিতর্ক চলছে। আমি মনে করি, বিতর্কে জড়িত উভয় পক্ষ নিরপেক্ষ নয়। দীর্ঘ পোষিত আবেগ ও ঘৃণা উভয় পক্ষকে সত্যভ্রষ্ট করেছে।
সমতা, স্বাধীনতা ও মৈত্রীর পতাকাবাহী একটি জাতিকে হঠাৎ কোন আবেগ প্ররোচিত করল যে হজরত মুহাম্মদের স. ব্যঙ্গাত্মক ছবি প্রদর্শন করে স্বাধীনতার গণচেতনা সৃষ্টি করতে হবে? একে চুলকানি ও প্ররোচনা ছাড়া আর কি বলা যায়?

কোনো হত্যাকান্ডকে কোনো অজুহাতে সমর্থন করা যায়না। তা সত্ত্বেও, কিছু অস্বস্তিকর তথ্য স্মরণ করিয়ে দেওয়া অপ্রাসঙ্গিক হবে না। এই মহামহিম ফরাসি প্রজাতন্ত্র পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিশেষ করে আফ্রিকায় উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করে, গত শতাব্দীতে ঐসব অধিকৃত অঞ্চলের মানুষের জীবন ও সম্পদ নিয়ে যে অমানবিক খেলা করেছে তা শুধু অমার্জনীয় অপরাধ বললে খুব কম বলা হবে। অধিকৃত অঞ্চলে তাদের পৈশাচিক তান্ডবের শিকার কয়েক কোটি মানুষ। পৈশাচিক নির্যাতন, পাইকারি বলাৎকার! আলজেরিয়া ও লিবিয়ার এক তৃতীয়াংশ মুক্তিকামী মানুষকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। তারা একজন ফরাসির মৃত্যুর বদলে এক হাজার মানুষ হত্যা করেছে। আর আজ একজন ফরাসির মৃত্যুতে যেন বিশ্ব যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। অথচ বিনা প্ররোচনায় তারা দেশে দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য ও দূর্বল জাতিগুলোকে সন্ত্রস্ত করতে সম্প্রতি আফগান অভিযান, ইরাক অভিযান, লিবিয়া অভিযান ও সোমালিয়া অভিযান করে সেদেশের কত নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে! ধ্বংসাত্মক মারণাস্ত্র নিক্ষেপ করে পৃথিবীর অন্যতম পরাক্রমশালী শক্তি রূপে নিজেকে জাহির করে, কেউ সাম্য, স্বাধীনতা ও মৈত্রী প্রতিষ্ঠার দেবদূত হতে পারে না!

আমরা কঠোর ভাষায় নিন্দা করছি, যারা অকারণে মুসলিমদের প্ররোচিত করতে হজরত মুহাম্মদের স. ব্যঙ্গাত্মক ছবি প্রদর্শন করে এবং ইসলাম ধর্ম বিষয়ে ঘৃণা প্রকাশ করে। তবে কথিত ব্যক্তির অপরাধ প্রমাণ করে রাষ্ট্র দ্বারা শাস্তির ব্যবস্থা না করে কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করা সমান নিন্দনীয়। কারণ এভাবে শুধুমাত্র নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়। ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হয় না।